ভূমিকা
অনেক পুরুষই অণ্ডকোষে ব্যথা, ভারী অনুভূতি বা সন্তান ধারণে সমস্যার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাদের অনেকেরই Varicocele (ভ্যারিকোসিল) ধরা পড়ে। এটি পুরুষদের একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অনেকেই এ সম্পর্কে জানেন না। আবার অনেকে মনে করেন এটি ক্যান্সার বা খুবই বিপজ্জনক রোগ, যা সঠিক নয়।
ভ্যারিকোসিল হলো অণ্ডকোষের শিরাগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত বা ফুলে যাওয়া। এটি অনেকটা পায়ের ভ্যারিকোজ ভেইনের মতো হলেও অবস্থান অণ্ডথলিতে (Scrotum)। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি বাম পাশে দেখা যায় এবং অনেকের কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে ব্যথা, অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যাওয়া, শুক্রাণুর মান কমে যাওয়া বা সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের প্রায় ১৫%-এর ভ্যারিকোসিল থাকতে পারে। প্রাথমিক বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে এর হার আরও বেশি এবং দ্বিতীয়বার বন্ধ্যাত্বের ক্ষেত্রে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তবে মনে রাখা জরুরি, সব ভ্যারিকোসিল বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে না এবং সব ক্ষেত্রেই অপারেশনের প্রয়োজন হয় না।
এই আর্টিকেলে আমরা ভ্যারিকোসিল সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইকৃত তথ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরেছি, যাতে আপনি রোগটি সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং প্রয়োজনে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।

Varicocele কী?
Varicocele হলো অণ্ডকোষের শিরাগুলোর (Pampiniform Plexus) অস্বাভাবিক প্রসারণ বা ফুলে যাওয়া। এই শিরাগুলোর কাজ হলো অণ্ডকোষ থেকে রক্ত হৃদয়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। যখন শিরার ভেতরের ভালভ ঠিকভাবে কাজ করে না, তখন রক্ত নিচের দিকে জমতে থাকে। ফলে শিরাগুলো ধীরে ধীরে ফুলে যায় এবং ভ্যারিকোসিল তৈরি হয়।
এটি সাধারণত বয়ঃসন্ধির পর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাম অণ্ডকোষে দেখা যায়। কারণ বাম পাশের শিরার গঠন ডান পাশের তুলনায় ভিন্ন হওয়ায় সেখানে রক্তের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে।
অনেক মানুষের কোনো লক্ষণই থাকে না এবং অন্য কোনো কারণে আল্ট্রাসাউন্ড বা শারীরিক পরীক্ষার সময় এটি ধরা পড়ে। আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বা ভারী অনুভূতি হতে পারে।
ভ্যারিকোসিলের গ্রেড
চিকিৎসক সাধারণত ভ্যারিকোসিলকে তিনটি গ্রেডে ভাগ করেন—
- Grade I: চাপ দিলে বা বিশেষ পরীক্ষা করলে বোঝা যায়।
- Grade II: হাত দিয়ে স্পর্শ করলে বোঝা যায়।
- Grade III: বাইরে থেকেও শিরা ফুলে থাকা দেখা যায়।
গ্রেড যত বেশি হবে, সমস্যা তত বেশি হবে—এমন নয়। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত মূলত উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা, শুক্রাণুর মান এবং রোগীর ভবিষ্যৎ সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে।

ভ্যারিকোসিলের লক্ষণ
অনেকের ক্ষেত্রে ভ্যারিকোসিলের কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে সেগুলো ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- অণ্ডকোষে হালকা বা মাঝারি ব্যথা
- দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যথা বৃদ্ধি পাওয়া
- দিনের শেষে অস্বস্তি বা ভারী অনুভূতি
- শুয়ে থাকলে ব্যথা কমে যাওয়া
- অণ্ডথলিতে শিরা ফুলে থাকা বা “কৃমির গুচ্ছ” (bag of worms)-এর মতো অনুভূতি
- একটি অণ্ডকোষ অন্যটির তুলনায় ছোট হয়ে যাওয়া
- সন্তান ধারণে সমস্যা
ব্যথা কেমন হতে পারে?
ভ্যারিকোসিলের ব্যথা সাধারণত তীব্র নয়। অনেকেই এটিকে টান লাগা, ভারী লাগা বা মৃদু ব্যথা হিসেবে বর্ণনা করেন। ব্যায়াম, দীর্ঘক্ষণ হাঁটা বা গরম আবহাওয়ায় এটি বাড়তে পারে।
কখন লক্ষণকে গুরুত্ব দেবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
- হঠাৎ তীব্র ব্যথা
- অণ্ডকোষে দ্রুত ফোলা
- এক পাশের অণ্ডকোষ দ্রুত ছোট হয়ে যাওয়া
- দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়া
- অণ্ডকোষে শক্ত গাঁট অনুভব হওয়া
ভ্যারিকোসিলের কারণ
ভ্যারিকোসিলের সুনির্দিষ্ট কারণ সব সময় জানা যায় না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান কারণ হলো শিরার ভালভ ঠিকমতো কাজ না করা।
স্বাভাবিক অবস্থায় এই ভালভ রক্তকে একদিকে প্রবাহিত হতে সাহায্য করে। ভালভ দুর্বল হয়ে গেলে রক্ত নিচে জমে যায় এবং শিরা প্রসারিত হতে শুরু করে।
সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- শিরার ভালভের জন্মগত দুর্বলতা
- বাম পাশের শিরার গঠনগত বৈশিষ্ট্য
- শিরায় অতিরিক্ত চাপ
- বয়ঃসন্ধিকালে দ্রুত বৃদ্ধি
- খুব কম ক্ষেত্রে পেটের ভেতরের কোনো টিউমার বা চাপ সৃষ্টি করা রোগ
কেন বাম পাশে বেশি হয়?
বাম টেস্টিকুলার শিরা সরাসরি বড় একটি শিরায় প্রবেশ না করে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। ফলে সেখানে রক্তের চাপ বেশি থাকে এবং ভ্যারিকোসিল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
ভ্যারিকোসিল রোগ নির্ণয়
ভ্যারিকোসিল নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হলো একজন ইউরোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের শারীরিক পরীক্ষা।
চিকিৎসক সাধারণত দাঁড়ানো অবস্থায় অণ্ডকোষ পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনে রোগীকে জোরে শ্বাস আটকে চাপ দিতে (Valsalva maneuver) বলা হতে পারে, যাতে ফুলে থাকা শিরাগুলো সহজে বোঝা যায়।
আল্ট্রাসাউন্ড
যদি শারীরিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া না যায়, তাহলে Scrotal Doppler Ultrasound করা হয়। এটি শিরার প্রসারণ এবং রক্তের উল্টো প্রবাহ (Reflux) শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
বীর্য পরীক্ষা (Semen Analysis)
যদি সন্তান ধারণে সমস্যা থাকে, তবে চিকিৎসক বীর্যের পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন। এতে দেখা হয়—
- শুক্রাণুর সংখ্যা
- চলাচলের ক্ষমতা
- আকৃতি
সব রোগীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না; রোগীর বয়স, উপসর্গ এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
Varicocele-এর চিকিৎসা
সব ভ্যারিকোসিলের চিকিৎসা বা অপারেশন দরকার হয় না।
যদি কোনো উপসর্গ না থাকে, অণ্ডকোষের বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে এবং সন্তান ধারণে সমস্যা না থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
হালকা উপসর্গ থাকলে চিকিৎসক পরামর্শ দিতে পারেন—
- দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকা
- ভারী ওজন তোলা সীমিত করা
- প্রয়োজনে স্ক্রোটাল সাপোর্ট ব্যবহার
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক গ্রহণ
কখন অপারেশন দরকার হতে পারে?
নিম্নলিখিত পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচার বিবেচনা করা হতে পারে—
- দীর্ঘদিনের ব্যথা
- বীর্য পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা
- অণ্ডকোষের বৃদ্ধি কমে যাওয়া (বিশেষ করে কিশোরদের ক্ষেত্রে)
- চিকিৎসকের মূল্যায়নে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে
বর্তমানে Microsurgical Varicocelectomy অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ও নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি বা এম্বোলাইজেশনও করা হয়।
ভ্যারিকোসেলের ঝুঁকির কারণ
কিছু বিষয় ভ্যারিকোসিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে—
- বয়ঃসন্ধিকাল
- জন্মগতভাবে শিরার ভালভ দুর্বল হওয়া
- পরিবারের কারও একই সমস্যা থাকা
- বাম পাশের শিরার গঠনগত বৈশিষ্ট্য
তবে নিয়মিত ব্যায়াম, যৌনজীবন বা হস্তমৈথুন ভ্যারিকোসিলের সরাসরি কারণ—এমন প্রমাণ নেই।
ভ্যারিকোসিলের জটিলতা
চিকিৎসা না করলে সবার ক্ষেত্রে জটিলতা হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে—
- দীর্ঘমেয়াদি অণ্ডকোষের ব্যথা
- আক্রান্ত অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যাওয়া
- শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণগত মান কমে যাওয়া
- কিছু ক্ষেত্রে সন্তান ধারণে সমস্যা
- টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা (নির্দিষ্ট কিছু রোগীর ক্ষেত্রে)
কখন ডাক্তার দেখাবেন
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
- অণ্ডকোষে ব্যথা কয়েকদিনের বেশি স্থায়ী হলে
- অণ্ডথলিতে ফোলা বা শিরা স্পষ্ট দেখা গেলে
- একটি অণ্ডকোষ ছোট হয়ে গেলে
- এক বছর চেষ্টা করার পরও সন্তান না হলে
- হঠাৎ তীব্র ব্যথা বা দ্রুত ফোলা দেখা দিলে
হঠাৎ তীব্র ব্যথা সব সময় ভ্যারিকোসিলের কারণে হয় না। এটি টেস্টিকুলার টর্শনের মতো জরুরি সমস্যার লক্ষণও হতে পারে, যার দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রতিরোধ
ভ্যারিকোসিল সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করার নির্দিষ্ট উপায় নেই, কারণ এটি অনেক ক্ষেত্রেই শারীরবৃত্তীয় বা জন্মগত কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে কিছু অভ্যাস উপসর্গ কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- অণ্ডকোষে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- দীর্ঘদিন ব্যথা উপেক্ষা করবেন না।
- সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে প্রয়োজনে বীর্য পরীক্ষা করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভেষজ ওষুধ বা অনলাইন প্রচারিত তথাকথিত “স্থায়ী সমাধান” ব্যবহার করবেন না।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন, বিশেষ করে যদি আগে ভ্যারিকোসিল ধরা পড়ে থাকে।
উপসংহার
ভ্যারিকোসিল একটি সাধারণ পুরুষজনিত সমস্যা, তবে এটি সব সময় বিপজ্জনক নয়। অনেকের কোনো উপসর্গ থাকে না এবং চিকিৎসারও প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা, অণ্ডকোষের পরিবর্তন বা সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিজের উপসর্গকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভ্যারিকোসিল মানেই বন্ধ্যাত্ব নয় এবং ভ্যারিকোসিল মানেই অপারেশনও নয়। রোগীর বয়স, উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা, বীর্য পরীক্ষার ফল এবং ভবিষ্যৎ পরিবার পরিকল্পনা বিবেচনা করে চিকিৎসক উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
তথ্যসূত্র
এই নিবন্ধটি প্রস্তুত করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গাইডলাইন ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিষয়ক উৎসের তথ্য অনুসরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- European Association of Urology (EAU) Guidelines on Sexual and Reproductive Health
- American Urological Association (AUA)
- American Society for Reproductive Medicine (ASRM)
- World Health Organization (WHO)
- Mayo Clinic
- Cleveland Clinic
- PubMed-এ প্রকাশিত রিভিউ ও গবেষণা নিবন্ধসমূহ
দায়মুক্তি (Disclaimer): এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যবিষয়ক সাধারণ তথ্য প্রদানের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে। এটি কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার বিকল্প নয়। আপনার উপসর্গ থাকলে অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
